২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য সংকোচন অব্যাহত রয়েছে। গত তিন বছরে মস্কোর সঙ্গে আমদানি-রফতানিতে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে ইইউ। পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) থেকে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) রাশিয়ামুখী রফতানি ৬১ শতাংশ ও আমদানি ৮৯ শতাংশ কমেছে। এতে এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রান্তিক ভিত্তিতে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত দেখল ইইউ।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে ইউরো নিউজ বলছে, ২০০২ সাল থেকে আমদানি-রফতানির তথ্য নথিভুক্ত করছে ইইউ। ওই সময়ের পর থেকে দুই অঞ্চলের বাণিজ্য ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে গত এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে। দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে ওই প্রান্তিকে প্রথমবার রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্তে রেকর্ড গড়েছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, জুনে শেষ হওয়া প্রান্তিকে রাশিয়া থেকে ইইউর আমদানি কমেছে। অন্যদিকে রাশিয়ামুখী রফতানি জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে। ফলে সবসময় বাণিজ্য ঘাটতিতে থাকা ইইউ এবার রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার পাশাপাশি ৫০ কোটি ইউরোর মতো ছোট আকারের উদ্বৃত্ত যোগ করেছে। এ সময় ইইউর আমদানি-রফতানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৭০০ কোটি ও ৭৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ দুই অঞ্চলের মোট ১ হাজার ৪৫০ কোটি ইউরোর বাণিজ্য হয়েছে।
২০২২ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় গত প্রান্তিকে ইইউ ও রাশিয়ার বাণিজ্য সংকুচিত হয়েছে ৮২ শতাংশ। যুদ্ধ শুরুর ওই প্রান্তিকে তাদের বাণিজ্যের আকার ছিল ৮ হাজার ১৯০ কোটি ইউরো। এ দুই অঞ্চলের সর্বোচ্চ বাণিজ্য হয়েছিল ২০১৩ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে, যার আকার ছিল ৮ হাজার ২৯০ কোটি ইউরো।
ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) বা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মোস্ট-ফেবার্ড নেশন বা এমএফএন সুবিধা পেয়ে আসছিল মস্কো। কিন্তু ২০২২ সালের ১৫ মার্চ ইইউ, জি৭ জোটসহ অন্যান্য সহযোগী দেশগুলো একযোগে সে সুবিধা বাতিল করে চতুর্থ দফার নিষেধাজ্ঞা চালু করে। ইইউ সরাসরি আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি না করে, নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি ও রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইইউর রফতানিতে রাশিয়ার হিস্যা ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নেমে এসেছে ১ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময় আমদানি ৯ দশমিক ৩ থেকে কমে এসেছে ১ দশমিক ১ শতাংশ।
ইইউর সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য ভারসাম্য মূলত জ্বালানি পণ্যনির্ভর। উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে এ খাতে বাণিজ্য ঘাটতি ২০২২ সালের এপ্রিল-জুনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২৮০ কোটি ইউরোয় পৌঁছে। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আমদানি সীমাবদ্ধতা ও জ্বালানি মূল্যহ্রাসের কারণে ঘাটতি কমে ৪২০ কোটি ইউরোয় নেমে এসেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইইউর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় রুশ জ্বালানি তেলের ওপর থেকে নির্ভরতা কমানো। এক্ষেত্রে অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইইউর পেট্রোলিয়াম আমদানিতে রাশিয়ার হিস্যা ছিল ২৯ শতাংশ, যা গত প্রান্তিকে ২ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ে থেকে পেট্রোলিয়াম আমদানি বেড়েছে যথাক্রমে ৫ ও ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
এছাড়া রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অংশ ৩৯ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৩ শতাংশ। দস্তা আমদানি ৪১ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৫ শতাংশ। এছাড়া লোহা ও ইস্পাতের আমদানি কমে ১৮ থেকে ৬ শতাংশ হয়েছে।